একজন জিয়াউর রহমান

১৯৬৫ সালের সেপ্টেম্বর। পাকিস্তানের ক্ষমতায় সামরিক শাসক ফিল্ড মার্শাল আইয়ুব খান। সেই সময়ে পাকিস্তান সেনাবাহিনী “অপারেশন গিবরালটার” ও “অপারেশন গ্র্যান্ড স্ল্যাম” নামে দুটি পরিকল্পনা নেয় কাশ্মীর দখলের উদ্দেশ্যে। মূল যুদ্ধক্ষেত্রে পাঠানো হয়নি বাঙালি সৈন্যদের। কারণ, পাকিস্তানি জেনারেলদের প্রচলিত ধারণা ছিল, “বাঙালিরা যুদ্ধ পারে না।”

কিন্তু ইতিহাস ভিন্ন পরিণতি লিখেছিল।

৬ সেপ্টেম্বর ভোরে ভারতীয় সেনারা পাল্টা আক্রমণে লাহোরের দিকে অগ্রসর হয়। তাদের ধারণা ছিল, বাঙালি সৈন্যদের অনুপস্থিতিতে পাকিস্তানের প্রতিরক্ষা ভেঙে ফেলা সহজ হবে। ভারতীয় সেনারা BRB খাল অতিক্রম করে দ্রুত লাহোর দখল করতে চেয়েছিল। কিন্তু এই মুহূর্তেই সামনে দাঁড়িয়ে যায় ১ম ব্যাটালিয়ন ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্ট।

বাংলাদেশি সৈন্যদের সেই লড়াই আজও পাকিস্তান সেনাবাহিনীর ইতিহাসে অন্যতম উজ্জ্বল অধ্যায়। লাহোর সেক্টরে প্রতিরক্ষার প্রথম সারিতে দাঁড়িয়ে তারা ভারতীয় অগ্রযাত্রা রুখে দেয়, শত্রুপক্ষের একাধিক ট্যাংক ধ্বংস করে। যুদ্ধ চলাকালে ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্ট সর্বোচ্চ সংখ্যক গ্যালান্ট্রি পুরস্কার অর্জন করে—৩টি Sitara-e-Jurat এবং ৮টি Tamgha-e-Jurat। এ অর্জন পাকিস্তান সেনাবাহিনীর অন্য কোনো রেজিমেন্ট সে সময়ে পায়নি।

তৎকালীন ক্যাপ্টেন জিয়াউর রহমান এই যুদ্ধে একটি কোম্পানির নেতৃত্ব দেন। সাহস ও বীরত্বের জন্য তিনি পান পাকিস্তানের দ্বিতীয় সর্বোচ্চ সামরিক সম্মাননা Hilal-i-Jur’at। পাকিস্তান সেনাবাহিনীর অফিসিয়াল রেকর্ড অনুযায়ী, জিয়ার নেতৃত্বাধীন ইউনিট Khemkaran সেক্টরে অসাধারণ লড়াই করেছিল (সূত্র: Hasan-Askari Rizvi, Military, State and Society in Pakistan)।

এই যুদ্ধ একটি ঐতিহাসিক ভ্রান্ত ধারণাকে ভেঙে দেয়। ভারত ভেবেছিল বাঙালি সৈন্যরা তাদের প্রতিহত করতে পারবে না, পাকিস্তানের উর্দুভাষী জেনারেলরাও মনে করত বাঙালিরা কেবল শ্রমজীবী জাতি, যুদ্ধক্ষেত্র তাদের জায়গা নয়। কিন্তু ৬ সেপ্টেম্বরের লাহোর প্রান্তরে ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্ট প্রমাণ করেছিল, বাংলার সৈন্যরা যেমন সাহসী, তেমনই দক্ষ।

প্রখ্যাত সামরিক গবেষক ইশফাক ইলাহী চৌধুরী লিখেছেন,

“লাহোর সেক্টরে ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টের প্রতিরোধ ছিল পাকিস্তান আর্মির ইতিহাসে এক গৌরবময় অধ্যায়। এই রেজিমেন্টই সর্বাধিক গ্যালান্ট্রি অ্যাওয়ার্ড অর্জন করে, যা বাঙালি সৈন্যদের বীরত্বের স্বীকৃতি।”

ষাট বছর আগের সেই যুদ্ধ আজও একটি শিক্ষা দিয়ে যায়, কোনো জাতিকে খাটো করে দেখা ইতিহাসের বড় ভুল হতে পারে। ১৯৬৫ সালের ৬ সেপ্টেম্বর প্রমাণ হয়েছিল, বাংলার মাটি শুধু কবি-সাহিত্যিক নয়, বীর সৈনিকও জন্ম দিতে পারে।

Related Articles

নক্ষত্রের মৃত্যু নেই- একজন দেশনেত্রী খালেদা জিয়া

ওসমান হাদি হত্যাচেষ্টাকে বিচ্ছিন্ন ঘটনা বলে দাবি সিইসির