হায়দ্রাবাদ মুসলিম গণহত্যা: ১৯৪৮

ভারতের দক্ষিণে ডেকান মালভূমিতে বিস্তৃত ছিল হায়দরাবাদ রাষ্ট্র। আয়তনে প্রায় ৮৬ হাজার বর্গমাইল, এটি ছিল এক বিরাট ভূখণ্ড। শাসক মীর ওসমান আলী খান, সপ্তম নিযাম, ছিলেন সমগ্র পৃথিবীর ধনীতম সম্রাটদের একজন। ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের ইতিহাসবিদরাই স্বীকার করেছেন, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর যখন ইংল্যান্ড আর্থিক সংকটে ভুগছিল, নিযামের অনুদান তাদের বাঁচতে সহায়তা করেছিল। শুধু তাই নয়, তিনি মক্কার পানির খরচ ও মদিনার বিদ্যুতের বিল নিয়মিত দিতেন। তাঁর তৈরি “মদিনা বিল্ডিং” আজও দাঁড়িয়ে আছে, যা ছিল হজযাত্রীদের সেবার উদ্দেশ্যে নির্মিত।

১৯৪৭ সালে ব্রিটিশরা ভারত ছেড়ে গেলে হায়দরাবাদের সামনে প্রশ্ন দাঁড়াল, ভারতে যোগ দেবে, নাকি স্বাধীন থাকবে? নিযাম স্বাধীন থাকতে চাইলেন। কিন্তু চারদিকে ভারতের ভূখণ্ডে ঘেরা এক রাজ্যের পক্ষে আলাদা রাষ্ট্র হিসেবে টিকে থাকা ছিল অবাস্তব। তাছাড়া ১ কোটি ৬৪ লাখ মানুষের মধ্যে মুসলমান ছিলেন মাত্র ৩০ লাখ। সংখ্যাগরিষ্ঠ হিন্দু জনগোষ্ঠীর ওপর সংখ্যালঘু মুসলমানের শাসন কতদিন টিকে থাকবে, সেটিও বড় প্রশ্ন ছিল।

এই সময়টায় মুসলিম নেতৃত্বের ভেতর বিভক্তি তৈরি হয়। নবাব বাহাদুর ইয়ার জঙ্গ ছিলেন একমাত্র নেতা যিনি বাস্তবতার রাজনীতি বোঝাতেন। কিন্তু হঠাৎ তাঁর মৃত্যু ঘটে। ইতিহাসবিদ আলি খান তাঁর The Tragedy of Hyderabad গ্রন্থে দাবি করেছেন, তাঁকে বিষ প্রয়োগে হত্যা করা হয়। তাঁর মৃত্যুর পরই আবেগী নেতৃত্বে কাসিম রিজভী ও তাঁর রাজাকার বাহিনী প্রাধান্য পায়। আবেগী স্লোগান আর দুর্বল অস্ত্রশস্ত্র নিয়ে রাজাকারদের উত্থান হায়দরাবাদের পতনের মঞ্চ তৈরি করে দেয়।

হায়দরাবাদের রাজনীতি তখন তিন দিকে ছিন্নভিন্ন। একদিকে ছিল রাজাকার বাহিনী, অন্যদিকে তেলেঙ্গানার কমিউনিস্ট আন্দোলন, আর তৃতীয় দিকে ছিল হিন্দু সাম্প্রদায়িক সংগঠন যেমন আর্য সমাজ ও হিন্দু মহাসভা। এই তিন শক্তি একে অপরের সঙ্গে সংঘর্ষে লিপ্ত হয়। রাজাকারদের প্রতিরোধ ছিল ছিন্নভিন্ন, কমিউনিস্টরা কৃষক বিদ্রোহের নামে নিযামের বিরোধিতা করছিল, আর হিন্দু সাম্প্রদায়িক সংগঠনগুলো ভারতভুক্তির দাবিকে সাম্প্রদায়িক রঙ দিচ্ছিল। ফলে হায়দরাবাদ ক্রমশ অস্থিতিশীল হয়ে ওঠে।

১৯৪৮ সালের সেপ্টেম্বর। দিল্লির সিদ্ধান্ত স্পষ্ট হায়দরাবাদকে আর স্বাধীন থাকতে দেওয়া হবে না। ১৩ সেপ্টেম্বর শুরু হয় ভারতীয় সেনার অভিযান, যার নাম দেওয়া হয় “অপারেশন পলো”। নামটি ছিল ব্যঙ্গাত্মক, কারণ নিযাম পরিবারের রাজপুত্ররা পোলোর খেলায় খ্যাত ছিলেন। ২২ দিক থেকে সেনারা প্রবেশ করে। শোলাপুর দিক থেকে সবচেয়ে বড় আক্রমণ হয়। রাজাকারদের প্রতিরোধ ভেঙে পড়ে। চার দিনের মধ্যে সব শেষ হয়ে যায়। ১৭ সেপ্টেম্বর নিযাম রেডিওতে আত্মসমর্পণের ঘোষণা দেন।

The Razakars of the State of Hyderabad.

অপারেশন শেষ হওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই শুরু হয় আসল ভয়াবহতা। ভারতীয় সেনাদের সঙ্গে স্থানীয় সাম্প্রদায়িক সংগঠনের সদস্যরা মুসলমানদের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ে। গ্রাম থেকে গ্রাম ঘিরে ফেলা হয়। পুরুষদের বাড়ি থেকে বের করে গুলি করে মারা হয়। অসংখ্য নারী ধর্ষণের শিকার হন। ঘরবাড়ি পুড়িয়ে দেওয়া হয়, লুটতরাজ চলে অবাধে। শিশুরা এতিম হয়ে রাস্তায় পড়ে থাকে।

এই হত্যাযজ্ঞের পর জনমত শান্ত করতে নেহরু সরকার সুন্দরলাল কমিটি গঠন করে। তাদের রিপোর্ট বহু বছর চাপা রাখা হয়। অবশেষে ২০১৩ সালে তা প্রকাশ পায়। রিপোর্টে লেখা ছিল,

সেনারা মুসলমান গ্রামগুলোতে নিরস্ত্র পুরুষদের গুলি করে হত্যা করেছে। মুসলমানদের অস্ত্র কেড়ে নেওয়া হলেও হিন্দু গ্রামগুলোতে অস্ত্র রাখতে দেওয়া হয়েছিল। আর্য সমাজ ও হিন্দু মহাসভার সশস্ত্র সদস্যরা সেনার সহযোগিতায় গণহত্যা চালায়।

ইতিহাসবিদদের হিসাবে, এই অভিযানে ২৭ থেকে ৪০ হাজার মুসলমান নিহত হয়। মাত্র তিন দিনে মুসলিম প্রাপ্তবয়স্ক পুরুষ জনসংখ্যার প্রায় ২০% নিশ্চিহ্ন হয়ে যায়।

The Nizam of Hyderabad receiving Sardar Patel after Operation Polo

আমরা খুবই রক্ষণশীল অনুমানে বলতে পারি যে পুলিশি অভিযানের সময় এবং পরে সমগ্র রাজ্যে কমপক্ষে ২৭ হাজার থেকে ৪০ হাজার মানুষ প্রাণ হারিয়েছেন। কর্তৃপক্ষ আমাদের জানিয়েছে যে এই আটটি জেলাই সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত এবং আমাদের প্রতিনিধিদলের সবচেয়ে বেশি সহযোগিতার প্রয়োজন ছিল। তাই আমরা এই বিষয়গুলিতে মনোনিবেশ করেছি এবং পারস্পরিক শত্রুতা এবং অবিশ্বাসের পরিবেশ দূর করতে কিছুটা হলেও সফল হয়েছি।

— সুন্দর লাল কমিটির প্রতিবেদন

প্রভাবিত এলাকার প্রায় সর্বত্রই সাম্প্রদায়িক উগ্রতা খুনের ঘটনায় নিজেকে নিমজ্জিত করেনি, শুধুমাত্র কিছু জায়গায় এমনকি নারী ও শিশুরাও রেহাই পায়নি। ধর্ষণ, নারীদের অপহরণ (কখনও কখনও রাজ্যের বাইরে শোলাপুর এবং নাগপুরের মতো ভারতীয় শহরে) লুটপাট, অগ্নিসংযোগ, মসজিদের গোপন স্থান (যেমন), জোরপূর্বক ধর্মান্তর, ঘরবাড়ি ও জমি দখল, হত্যাকাণ্ডের পরে বা তার সাথে ছিল।

— সুন্দর লাল কমিটির রিপোর্ট

“সৈন্যরা হিন্দু জনতাকে মুসলিম দোকান ও ঘরবাড়ি লুট করতে উৎসাহিত, প্ররোচিত এবং বাধ্য করেছিল”

প্রতিবেদনে আরও উল্লেখ করা হয়েছে যে ভারতীয় সেনাবাহিনী কেবল বিভিন্ন বর্বরতায় লিপ্ত ছিল না, বরং এটি মানুষকে সহিংসতা ঘটাতেও উস্কে দিয়েছিল।

কর্তব্যবোধ আমাদের আরও যোগ করতে বাধ্য করে যে আমাদের কাছে একেবারেই অকাট্য প্রমাণ রয়েছে যে ভারতীয় সেনাবাহিনী এবং স্থানীয় পুলিশের সদস্যরা লুটপাট এবং এমনকি অন্যান্য অপরাধে অংশ নিয়েছিল। আমাদের সফরের সময় আমরা দেখতে পেলাম যে সৈন্যরা হিন্দু জনতাকে মুসলিম দোকান ও ঘরবাড়ি লুট করতে উৎসাহিত, প্ররোচিত এবং এমনকি বাধ্য করেছিল। একটি জেলা শহরে বর্তমান হিন্দু প্রশাসন প্রধান আমাদের বলেছিলেন যে সেনাবাহিনী দ্বারা মুসলিম দোকানগুলিতে সাধারণ লুটপাট করা হয়েছে। অন্য একটি জেলায় সৈন্যরা একটি মুন্সেফের বাড়ি, অন্যান্য জিনিস লুট করেছে এবং একজন তহসিলদারের স্ত্রীকে নির্যাতন করেছে।

— সুন্দর লাল কমিটির প্রতিবেদন

ছয় দশকেরও বেশি সময় ধরে সুন্দরলাল কমিটির রিপোর্টকে লুকিয়ে রাখা হয়েছিল। কেন? কারণ রাষ্ট্র জানত, মুক্তির নামে যে হত্যাযজ্ঞ চালানো হয়েছিল, তা প্রকাশ হলে স্বাধীনতার মুখোশ খুলে যাবে।

হায়দরাবাদে কয়েক লক্ষ মানুষের রক্ত ঝরানোকে কি আমরা মুক্তি বলব? না, সেটা মুক্তি নয়, সেটা ছিল রাষ্ট্রীয় দমননীতি, ছিল ভয়ংকর গণহত্যা। মানুষের জীবন ও সম্মান যদি পদদলিত হয়, তবে সেই মুক্তি শৃঙ্খলের চেয়েও ভয়ংকর।

আজ যারা মুক্তি দিবসের নামে উৎসব করে, তারা আসলে এক মানবিক বিপর্যয়কে অপমান করে। তারা শহীদের আর্তনাদ, নারীর কান্না, শিশুর দগ্ধ চিৎকার সবকিছুকে মাটিচাপা দিয়ে আনন্দের ঢাক বাজায়। এ উদযাপন মানবতার সাথে বিশ্বাসঘাতকতা ছাড়া আর কিছু নয়।

প্রশ্ন হলোযে রাষ্ট্র রক্তের উপর দাঁড়িয়ে স্বাধীনতার অভিনয় করেতার ইতিহাসের আসল নাম কীমুক্তিনাকি গণহত্যার বৈধতা?

Related Articles

নক্ষত্রের মৃত্যু নেই- একজন দেশনেত্রী খালেদা জিয়া

ওসমান হাদি হত্যাচেষ্টাকে বিচ্ছিন্ন ঘটনা বলে দাবি সিইসির