Gaza Freedom Flotilla: গাজার অবরোধ ভাঙার বৈশ্বিক প্রতিবাদ

“When injustice becomes law, resistance becomes duty”, যখন অন্যায় আইন হয়ে দাঁড়ায়, তখন প্রতিরোধই হয়ে ওঠে ন্যায়। গাজাবাসীর পাশে দাঁড়াতে রাষ্ট্রগুলো যখন ব্যর্থ, আন্তর্জাতিক আদালত যখন ইসরায়েলকে যুদ্ধাপরাধী হিসেবে নিরপেক্ষভাবে বিচার করতে অক্ষম, তখন মানুষের প্রতি মানুষের মমত্ববোধই হয়ে উঠছে সবচেয়ে বড় শক্তি। সেই শক্তিই আজ গাজাবাসীর পাশে দাঁড়াতে সাহস যোগাচ্ছে হাজার হাজার মানুষকে, ২০২৫ সালের সমুদ্রে ভাসমান ফ্লোটিলা তার সবচেয়ে বড় উদাহরণ।

তবে এ উদ্যোগ প্রথম নয়, যখনই ইসরায়েল যুদ্ধাপরাধ করেছে, তখনই বিশ্ব নাগরিকরা প্যালেস্টাইনের মানুষের পাশে দাঁড়াতে ফ্লোটিলা ভাসিয়েছে।

২০০৭ সালে হামাস গাজা নিয়ন্ত্রণ নেওয়ার পর ইসরায়েল সমুদ্র ও স্থলপথে অবরোধ কঠোর করে। এর প্রতিবাদে আন্তর্জাতিক কর্মীরা গাজা ফ্রিডম ফ্লোটিলা (Gaza Freedom Flotilla) শুরু করেন। সবচেয়ে আলোচিত ঘটনা ঘটে ২০১০ সালে, যখন মাভি মারমারা জাহাজসহ কয়েকটি জাহাজ গাজা উপকূলে পৌঁছাতে চাইলে ইসরায়েলি সেনারা আন্তর্জাতিক জলসীমায় হামলা চালায়। সেই গোলাগুলিতে ৯ জন কর্মী নিহত হন। এই ঘটনার পর বিশ্বজুড়ে তীব্র আলোচনা তৈরি হয় এবং ফ্লোটিলা আন্দোলন আরও পরিচিতি পায়।

অক্টোবর ২০২৩-এর যুদ্ধের পর আবার নতুন করে ফ্লোটিলা যাত্রা শুরু হয়। এ অভিযানের পরিকল্পনা ছিল মেডিসিন, খাদ্য ও জ্বালানি নিয়ে সরাসরি গাজায় প্রবেশ করা, আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমকে সচেতন করা এবং ইসরায়েলের অবরোধকে “অবৈধ” হিসেবে প্রকাশ করা। কর্মীরা স্পষ্ট জানায়, তারা ইসরায়েলি বন্দরে গিয়ে সাহায্য নামাবে না, কারণ সেক্ষেত্রে ত্রাণ প্রায়ই গাজায় পৌঁছায় না।

“ইসরায়েল বারবার আন্তর্জাতিক আইন লঙ্ঘন করছে, নৌকাগুলোতে হামলা করে, আন্তর্জাতিক জলসীমায় অবৈধভাবে জাহাজ থামিয়ে দিয়ে, আর মানবিক সহায়তা পৌঁছাতে বাধা দিয়ে।”

-গ্রেটা থুনবার্গ

২০২৫ সালের ফ্লোটিলার প্রথম যাত্রা বার্সেলোনা থেকে শুরু হয়েছিল। তবে খারাপ আবহাওয়ার কারণে সেই যাত্রা কিছু সময় পর ফিরে আসে। পরে, তিউনিস থেকে পুনরায় যাত্রা শুরু হয় এবং সেখানে আরও জাহাজ যোগ দেয়। এ বছরের লক্ষ্য শুধু গাজায় সহায়তা পৌঁছানো নয়, বরং রাফাহ সীমান্তে অবরুদ্ধ ত্রাণ প্রবেশ করানো। বাস্তবে দেখা গেছে, মাসের পর মাস রাফাহ সীমান্তে সাহায্যসামগ্রী আটকে আছে ইসরায়েলের বাধায়, যার ফলে শিশুদের অপুষ্টি, হাসপাতালের ওষুধ সংকট এবং সাধারণ মানুষের অনাহার ভয়াবহ রূপ নিয়েছে। কর্মীরা তাই মনে করেন, সরকারি সংস্থার উপর নির্ভর করলে গাজায় কার্যকরভাবে সাহায্য পৌঁছাবে না। এজন্য তারা নিজেদের হাতে সাহায্য পৌঁছানোর প্রতীকী উদ্যোগ নিয়েছেন, যাতে বিশ্ববাসী সরাসরি অবরোধের বাস্তবতা দেখতে পারে।

ফ্লোটিলার মতন এই মহৎ উদ্যোগে যোগ দিয়েছেন বিশ্বের নানা প্রান্তের মানবাধিকার কর্মী, চিকিৎসক, সাংবাদিক, আইনজীবী ও রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব। তাদের পরিকল্পনা সরাসরি গাজা উপকূলে পৌঁছানো এবং জাহাজ থেকে ত্রাণ নামানো। আর যদি ইসরায়েলি নৌবাহিনী বাধা দেয়, তবে তারা আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমে এই অবরোধের চিত্র তুলে ধরবেন।

“আমাদের বুঝতে হবে, ইসরায়েলের কোনো আইনি ক্ষমতা নেই আমাদের জাহাজ আক্রমণ বা থামানোর। ব্যর্থতা আইনে নয়, বরং আইন প্রয়োগে অস্বীকৃতিতেই।”

-হুওয়িদা আরাফ

তিনি আরও যোগ করেন,

“এই অবরোধ সামষ্টিক শাস্তি, যা আন্তর্জাতিক আইনে যুদ্ধাপরাধ। রাষ্ট্র যখন ব্যর্থ হয় মানুষের জীবন ও মর্যাদা রক্ষায়, তখন বিবেকবান মানুষেরই এগিয়ে আসা প্রয়োজন।”

এছাড়াও এবার অংশগ্রহণকারীদের মধ্যে আছেন তুরস্ক, আয়ারল্যান্ড, দক্ষিণ আফ্রিকা, মালয়েশিয়া, নরওয়ে ও লাতিন আমেরিকার কর্মীরা। অনেক Médecins Sans Frontières (MSF) ও অন্যান্য মানবিক সংস্থার সদস্যও সংহতি জানিয়েছেন।

“আমাদের একটাই লক্ষ্য, অবরোধ ভাঙা এবং গাজার অবরুদ্ধ মানুষদের কাছে মানবিক সহায়তা পৌঁছে দেওয়া।”

-মান্ডলা মন্ডেলা

তিনি আরও বলেন,

“প্রশ্ন হলো সহিংসতা কারা চালাচ্ছে? একটাই হুমকি আছে, ইসরায়েলি এপারথাইড আর নেতানিয়াহুর সরকার।”

ফ্লোটিলা যাত্রা উপলক্ষে ইউরোপ, দক্ষিণ আমেরিকা ও এশিয়ার বিভিন্ন দেশে নাগরিকদের সমর্থন দেখা গেছে। শহরজুড়ে বিক্ষোভ, মিছিল ও অর্থসংগ্রহ অভিযান হয়েছে। সামাজিক মাধ্যমে সাধারণ মানুষ ফ্লোটিলা অংশগ্রহণকারীদের “মানবতার দূত” হিসেবে অভিহিত করেছে।

এদিকে আন্তর্জাতিক ডক ওয়ার্কার্স ইউনিয়ন (IDWU) ঘোষণা দিয়েছে, যদি ইসরায়েল ফ্লোটিলা আটকায়, তারা বিশ্বজুড়ে ইসরায়েলের কার্গো জাহাজ ও কন্টেইনার হ্যান্ডলিং বন্ধ করে দেবে। তাদের বার্তা ছিল,

“যদি সাহায্যের জাহাজ আটকানো হয়, আমরা নীরব থাকব না, মানবিক সাহায্য আটকে দেওয়া মানেই আন্তর্জাতিক শ্রমিক শ্রেণির বিরুদ্ধে অপরাধ।”

এতে ইসরায়েলের উপর বৈশ্বিক অর্থনৈতিক চাপ তৈরির সম্ভাবনা দেখা দিয়েছে।

আমরা সাধারণ মানুষ যখন প্যালেস্টাইনের জন্য কিছু করতে না পারার অসহায়ত্ববোধ করি, তখন ফ্লোটিলা আমাদের মনে নতুন আশার সঞ্চার করে। আমরা আশা করি, এ যাত্রা কোনো বিপদ ছাড়াই গাজাবাসীর কাছে পৌঁছাবে। তখন অন্তত আমাদের মনে স্বস্তি থাকবে, অসহায় মানুষদের পাশে কেও না কেও দাঁড়াতে পারছে।

২০২৫ সালের ফ্লোটিলা কেবল একটি ত্রাণ বহনের উদ্যোগ নয়, এটি এক বৈশ্বিক প্রতিবাদ, যা ইসরায়েলের অবরোধের বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক ঐক্যকে সুদৃঢ় করছে। কর্মীরা বিশ্বাস করেন, মানবিক সহায়তা আটকে দেওয়া কেবল অন্যায় নয়, এটি এক গভীর অপরাধ। এখন দেখার বিষয়, যুদ্ধাপরাধী ইসরায়েল আবার কোনো নতুন নোংরা খেলা শুরু করবে নাকি ফ্লোটিলা শেষমেশ পৌঁছাতে পারবে তার আসল ঠিকানায়।

Related Articles

নক্ষত্রের মৃত্যু নেই- একজন দেশনেত্রী খালেদা জিয়া

ওসমান হাদি হত্যাচেষ্টাকে বিচ্ছিন্ন ঘটনা বলে দাবি সিইসির